Wednesday, April 24, 2013

এক ক্ষত্রিয়ের পরাজয়

১)

নায়লা হুট করেই বিদেশ চলে এসেছে মাস্টার্স করতে। কানাডার ঘোর শীতের সময় নায়লার জন্য তাই বাসা ভাড়া পাওয়া যায়নি। একটা বাড়ি পাওয়া গেছে যেটা দিন পনের পর খালি হবে। ভাগ্যিস বুয়েটের এক সহপাঠী ছিলো এই ইউনিভার্সিটিতে। তার বদৌলতে বুয়েট-বাড়ি (যেখানে ৮টি বুয়েটের ছেলে থাকে) নামে খ্যাত এক বাড়ির লিভিংরুমে আশ্রয় মিলেছে। বিদেশে সাধারণত কয়েকজন ছাত্র একসাথে একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে তারপর একেক রুম নিয়ে থাকে। এই বাড়ির প্রায় সবাই বুয়েটের ছাত্র বলে এই বাড়ির নাম বুয়েট-বাড়ি।

দেশে নায়লা এক গ্লাস পানিও মনে হয় না নিজে ঢেলে খেয়েছে। এখন এখানে এসে সিনিয়র ভাইদের এবং সহপাঠীর কাছ থেকে রান্নার প্রাথমিক ধারণা নিচ্ছে। তাকে একদিন ভাত রান্না শেখালো এক ভাইয়া। নায়লা বললো আজ রাতে সে সবার জন্য ভাত রাঁধবে। রাতে সবাই ক্ষুধার্ত পেটে খেতে এসেছে, দেখে নায়লা ২ রাইসকুকারে চাল আর পানি দিয়েছে ঠিকই কিন্তু রাইসকুকার সুইচ অন করতে ভুলে গেছে। সবচেয়ে সিনিয়র ভাইটি তখন নিয়ম জারি করলেন নায়লা আর রান্না ঘরে ঢুকতে পারবে না এবং তাকে নিজের বাড়িতেও রান্না করার দরকার নেই। নায়লার যেই পাখির মতো শরীর, সবার উচ্ছিষ্ট খাবার থেকে ওর খাবার হয়ে যাবে!!!

২)

ইউনিভার্সিটিতে এক মহিলা চাইনিজ শিক্ষক আছেন, অতিশয় বর্ণবাদী। সবাই তাকে ডাকে প্রফেসর ঝ্যাং বলে। চাকরী এখনো স্থায়ী হয়নি বলে মহিলা খুব ভয়ে ভয়ে থাকেন। এর ইংরেজী বোঝা দায়, ভালো পড়াতে পারেন না। কানাডিয়ানদের বেশী নম্বর দিয়ে দেন যেনো এরা তার খামতি নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য না করে। খুব দরকারী কোর্স বলে এটা নায়লার নিতেই হলো। টার্মপেপার করার সময় সদ্য চীন থেকে আসা এক মেয়েকে পার্টনার করে নিলো। ওই মেয়ে মোটামুটি কোনো ইংলিশ পারেনা। একদিন নায়লাকে অনেকক্ষণ ধরে একটা শব্দ বোঝাতে চাইছিলো। তার চাইনিজ-ইংলিশ ক্যালকুলেটর সাইজের ট্রান্সলেটর দিয়ে, ছবি এঁকে, অনেকক্ষণ ‘guess what?’ গেইম খেলে শেষপর্যন্ত নায়লা যখন বলতে পারলো শব্দটি 'sand', চাইনিজ মেয়েটির চোখে সে রীতিমতো দেবী হয়ে গেলো। নায়লার মাথায় আইডিয়া ভালো খেলে, কিন্তু সে অনেক অলস। চাইনিজ মেয়েটি আবার বেশ খাটতে পারে। এই বিপরীত গুণের সমন্বয়ে তারা দুজন মিলে বেশ ভালো একটা টার্ম পেপার লিখে ফেললো, যেটা প্রফেসর ঝ্যাং এক কনফারেন্সের জন্য পাঠিয়ে দিলো। যেহেতু মূল আইডিয়া নায়লার, তাই মূল লেখক হিসেবে ওর নাম গেলো। কনফারেন্স কমিটি বললো পেপারটা খুব ভাল হয়েছে তাই অমুক জার্নাল পেপারে ছাপাতে দেয়া যেতে পারে। জার্নাল পেপারে জমা দেবার সময় প্রফেসর ঝ্যাং টুক করে মূল লেখক হিসেবে নিজের নাম দিয়ে দিলো। নায়লা ইমেইলটি পেয়েই রেগেমেগে প্রফেসর ঝ্যাং এর রুমে গেলো।
- আমি জার্নাল পেপারে কেনো দু’নম্বর লেখক?
- কারণ জার্নাল পেপারের জন্য আমার বাড়তি খাটুনি গেছে।
- বটে!!! দু’টি পেপারের মাঝে তো কোনো পার্থক্য নেই— একদম একই রকম।
- তোমার নামে পেপার গেলে কেউ ছাপাবে না। তাই বাধ্য হয়ে আমাকে মূল লেখক করতে হয়েছে।
- সেটা তুমি আগে দিয়েই দেখতে!!! আমি কোর্সেও এ্যাসাইনমেন্টগুলোতে সবার চেয়ে মোট ১৩ মার্ক বেশী পেয়েছিলাম, আমার টার্ম পেপার তুমি পাবলিশ করছো, তারপরো তুমি আমাকে ‘এ’ দিয়েছো আর ‘এ+’ দিয়েছো দুই গাধা কানাডিয়ানদের।
বিশাল তর্ক বেঁধে গেলো দুজনের মাঝে।
............
..............
..................
প্রফেসর ঝ্যাং একসময় বললেন, ‘তুমি বাংলাদেশ হতে এসেছো, গরীব একটি দেশ, তোমরা খাটতে থাকো। দেখবে তোমরাও একসময় চায়নার মতো জায়গায় চলে আসবে।’
একথার পর, চিৎকার চেঁচামেচিতে পুরো ডিপার্টমেন্টে জেনে গেলো নায়লা এবং প্রফেসর ঝ্যাং এর মাঝে সাপে-নেউলে সম্পর্ক বিদ্যমান।

৩)

ঠিক একবছর পর, নায়লা তখন নতুন ছেলেমেয়েদের বাসা ঠিক করে দিতে পারে। কোথায় মুড়ি ভালো পাওয়া যায়, সেই ব্যাপারে বুদ্ধি দিতে পারে। এমন কি পোলাউ হাঁড়ির নিচে না লাগার টেকনিকও মানুষকে শেখাতে পারে। ইউনিভার্সিটিতে তার প্রাণবন্ত হাসি দিয়ে আর সৎমানুষ হিসেবে বুড়ো জাঁদরেল প্রফেসরদের মন জয় করে নিয়েছে।

অনেক বাঙ্গালি বাংলাদেশে কাজ করা অবস্থায় কানাডার ইমিগ্রেশনের জন্য আবেদন করে, পরে ইমিগ্র্যান্ট হয়ে পরিবারসহ এখানে এসে বিপদে পড়ে। কারণ এখানে কানাডিয়ান ডিগ্রী ছাড়া চাকরীতে তেমন কাউকে পাত্তা দেয়া হয়না। তখন ওনাদের বাধ্য হয়ে মাঝবুড়ো বয়সে আবার পড়াশুনায় ফেরত আসতে হয়। আধাসমাজতান্ত্রিক দেশ বিধায় পড়াশুনা করার ঋণ সরকার হতে পাওয়া যায়। মোটের উপর, খারাপ না ডিলটা। যেহেতু আমাদের দেশে ইংরেজীতে কথা বলাটা তেমন ভালো করে শেখানো হয়না এবং তারা অনেকদিন পড়াশুনা হতে বিচ্ছিন্ন, তাই তা্দের মাঝে বেশিরভাগই ঠিক সবার সাথে তাল মেলাতে পারেননা।

নায়লা একটা কোর্সে বাঙ্গালী এক মধ্যবয়স্ক লোককে দেখল। প্রথম এ্যাসাইনমেন্টে রীতিমতো ডাব্বা মেরেছেন। করুনাবশত গিয়ে, জিজ্ঞেস করলো সাহায্য লাগবে না কি? লোকটি পুরো আকাশের চাঁদ হাতে পেলো। কথাপ্রসঙ্গে জানা গেলো, ওনার নাম জামান এবং উনি এই কোর্স ছাড়াও প্রফেসর ঝ্যাং এর কোর্স নিয়েছেন। তাই কুলিয়ে উঠতে পারছেনা। ইংরেজী পারেননা দেখে জামান ভাইকে প্রফেসর ঝ্যাং এর অনেক কটু কথা শুনতে হয়। নায়লার পুরানো ক্ষোভ ফিরে এলো, দাঁত কিড়মিড় করে বললো, ‘তাই বুঝি!! আপনি আপনার এ্যাসাইনমেন্টগুলো আমাকে দেখাবেন, আমি আপনাকে সাহায্য করবো।’

ধীরে ধীরে খাতির বাড়লো। নায়লার বিষ্ময় বাড়লো শুনে যে উনি ঢাকায় মাস্টার্স করে ১০ বছর সরকারী চাকরী করেছেন। তারপরও কানাডায় চাকরী না পেয়ে এখানে আবার আন্ডারগ্রাজুয়েট করেছেন, এখন মাস্টার্স করছেন। এরমাঝে প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং হিসেবে কানাডায় কাজ করার লাইসেন্সটাও নিয়ে রেখেছেন।
ওনার বউ বাংলাদেশ মেডিক্যাল হতে এম,বি,বি,এস করে এসেছেন, কিন্তু এখানে শুধু হাউসওয়াইফ। ওনাদের নয় এবং ছয় বছরের দুই ছেলে আছে, বেশ সুখী পরিবার। নায়লাকে প্রায়ই ওনাদের বাসায় দাওয়াত দেন জামান ভাই। নায়লার সামনেই ভাবিকে আনস্মার্ট বলে খোঁটা দেন, ভাবীর দ্বারা এইখানের পড়াশুনা হবেনা বলে তার দাবী। নায়লা ভাবীর পক্ষ নেয়, ‘জামান ভাই, আপনিতো ঘরের কোনো কাজ করেন না। ভাবীতো একলা হাতে পুরো সংসার চালান। ভাবী কিভাবে পড়াশুনা আবার শুরু করবে?’ ভাইয়া ভুলে যান কানাডা আসার অর্থনৈতিক সাহায্য ভাবীর বড়োলোক বাবাই তাদের দিয়েছিলেন। এখন না হয় জামান ভাই কানাডিয়ান সিটিজেন হয়ে গেছেন, কিন্তু শ্বশুরআব্বার জোর না থাকলে, এইখানে আসা হয়ে উঠতো না তার। ভাবী কেনো যেনো সব দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়ে নেন। শান্ত নিরীহ একজন মানুষ। নায়লাকে সে দুঃখ করে বলে, ‘তোমার ভাই আসলে একটু স্মার্ট মানুষ পছন্দ করে- আমি সংসার সামলে আর নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার সময় পাইনা।‘

নায়লার নিজের কোর্সওয়ার্ক আর রিসার্চের কাজ করে রাতের আগে সময় করে উঠতে পারেনা। জামান ভাইয়ের এ্যাসাইনমেন্টগুলোতে লেখালেখির কাজ প্রচুর, তাই অনেক সময় লেগে যায়। নায়লার বাসা ইউনিভার্সিটির কাছে দেখে ওর বাসায়ই রাতে কাজ করা হবে ঠিক করা হলো। দেখা গেলো উইকএ্যান্ডেই বেশী কাজ করা হয়। হাউসমেইটরা পার্টি করছে, আর নায়লা ও জামান ভাই ওর ঘরে ঘাড় গুঁজে কম্পিউটারে কাজ করছে। নায়লার বাসায় ৪ জন থাকে-- ও বাদে থাকে হলো মার্ক, স্টিভ এবং সারাহ। মার্ক গ্রীক দেবতার মতো সুন্দর সমকামী ছেলে, স্টিভ ম্যানিটোবার খনিতে অনেকদিন কাজ করে টাকা জমিয়ে এখন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ আন্ডারগ্রাজুয়েট করতে এসেছে। সারাহ এক সুন্দরী যে তার ছেলেবন্ধুসহ থাকে। এবাসায় এসে প্রথম তিনদিনের মাথায় নায়লা সিদ্দিকা কবিরের রেসিপি বই পড়ে চটপটি বানাতে গেছে। শুকনা মরিচ গুঁড়ো ভাঁজতে গেছে সব দরজা জানালা বন্ধ এবং হিটিং চালুরত বাসায়। ফলশ্রুতিতে, নায়লাসহ বাকীরা কাশতে কাশতে বাসা থেকে বেরুতে হয়েছে মাইনাস পনের ডিগ্রী তাপমাত্রার মাঝেও। পুরো দেড় ঘন্টা বাসার সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো!!

সবাই মিলে একদিন লিভিং রুমে টিভি দেখছে। মার্ক বললো ওই যে মাঝবয়সী লোকটা আসে, ও কি তোমার ছেলেবন্ধু? নায়লা বললো, ‘না তো!!!’ মার্ক বললো, ‘তাহলে উইকএ্যান্ডে তোমরা এতো কি করো?’ নায়লা উত্তর দেয়, ‘আমি ওকে এ্যাসাইনমেন্ট করতে সাহায্য করি।’ স্টিভ কথা কেড়ে নেয়, ‘ মার্ক, নায়লার দ্বারা এটা সম্ভব!!! আমি ওর ভয়ে একটা কোর্স ড্রপ করেছি এবার।’ মার্কের জিজ্ঞাসু দৃষ্টির উত্তরে স্টিভ বললো সে অংক ভুলে গেছে দেখে, একটু নায়লার কাছে সাহায্য চেয়েছিলো। এরপর থেকে নায়লা স্টিভের টিভিতে আইসহকি দেখা বন্ধ করে দিয়েছিলো।’ নায়লা মুখ ঝামটা দেয়, ‘তুমি সারাক্ষণ টিভি দেখলে পড়াশুনা করবে কখন?’ স্টিভ ভয়ার্তভঙ্গী করে বলে, ‘আমিতো কোর্স ড্রপ করে দিয়েছি, এবারতো দেখতে দাও।’ মার্ক উচ্চস্বরে হেসে উঠে বলে, ‘কিডো (সম্মোধনসূচক আদরের শব্দ)!!! তুমি ছেলে হলে আমি ঠিক তোমাকে বিয়ে করতাম!!’ এবার নায়লা গম্ভীরকন্ঠে উত্তর দেয়, ‘তুমি তোমার স্বাদ পাল্টালেই এখনো আমাকে বিয়ে করতে পারো।’ এবার সবাই একসাথে হেসে উঠে।

৪)

সামার চলে আসায় সবাই বাসা ছেড়ে ছুটিতে নিজের নিজের প্রদেশে চলে যাচ্ছে । সামার পুরোটা বাসায় খালি নায়লা একা থাকবে। সারাহ সবার শেষে গেলো, জড়িয়ে ধরে বললো সে বিয়ে করলে নায়লা যেন অবশ্যই যায়। ঐদিকে জামান ভাইও ‘এ’ পেয়েছে প্রফেসর ঝ্যাং কোর্সটায়। নায়লা নিজের কোর্সেও বেশ ভালো করেছে। জামান ভাই ফোন করে বললেন, ‘একটু কাজ আছে বাসায় আসতে চান।’ নায়লা বললো, ‘আচ্ছা, আসেন।’ জামান ভাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার বাসার সবাই কি চলে গেছে?’ নায়লা বললো, ‘হু।’ জামান ভাই বললেন, ‘চলে আসো আমাদের বাসায়। তোমার ভাবী খুশী হবেন।’ নায়লা রাজী হলোনা। জামান ভাই বললেন ঐদিন সন্ধ্যা সাতটায় আসবেন।

জামান ভাই বাসায় এসে ঘুরে ঘুরে খালি ঘর দেখছেন। নায়লা অস্থির হয়ে উসখুশ করছে, টিভিতে তার প্রিয় শো শুরু হলো বলে। জামান ভাইকে সে বললো, ‘ভাইয়া, কি কাজ বললেন না তো?’ একটা কড়িডোরের কোনায় দাঁড়িয়ে ছিলো দুজনে। হঠাৎ উনি নায়লাকে জড়িয়ে ধরে তার ঠোঁটে চুমু দেবার চেষ্টা করলেন। নায়লা কোনোমতে মুখ সরিয়ে জামান ভাইকে একটা লাথি দিয়ে ছুটে বাসা থেকে বের হয়ে গেলো। একদৌড়ে একি গলির আরেক বাসার জুনিয়র সোমনাথের দরজায় কড়া নাড়লো। রাতে পোলাও খাওয়াবে প্রতিশ্রুতিতে টেনে নায়লা ওকে নিজের বাসায় নিয়ে আসলো। সোমনাথের নজরে পড়েনি নায়লার পায়ে কোনো স্যান্ডেল নেই।

দুজনে এসে দেখে এখনো জামান ভাই বসে আছে। সোমনাথ না বুঝেই জামান ভাইয়ের সাথে গল্প করা শুরু করে দিলো। রাত একটার দিকে জামান ভাই রণে ভঙ্গ দিয়ে চলে যাবার পর সোমনাথকে নায়লা সব ঘটনা খুলে বললো। এক নির্বাচনের সময় চাঁদপুরের বাসিন্দা সোমনাথের বোনদের মুখে রং মেখে কালো করতে হয়েছিলো ওদের নিরাপত্তার জন্যই। সে মেয়েদের অসহায় অবস্থা বেশ ভালোমতোই জানে। সোমনাথ রাগে পুরো ফেটে পড়লো, ‘আপনি আগে বললেন না কেনো? এইসব লোকদের দরকার শক্ত মার।’ সোমনাথকে নায়লা বললো, ‘দাঁড়াও, আমি আইনিপথে যাবো। তুমি চিন্তা করোনা একদম।’ সোমনাথ ওকে অপরিচিত কাউকে দরজা না খোলার পরামর্শ দিয়ে চলে গেলো। ক্লান্ত নায়লা পায়ের রক্ত মুছে দেশে প্রেমিককে ফোন করে কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করলো। তারপর ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইট খুলে হিউম্যান রাইটসের অফিসের ঠিকানাটা নিলো।

পরেরদিন নায়লা হিউম্যান রাইটসের মহিলা অফিসারকে গিয়ে পুরো ঘটনা বর্ণনা করল। মহিলা সব শুনে প্রথমেই বললো, ‘পানি খাবে?’
নায়লা বললো, ‘হু।’
মহিলা পানি এনে দিয়ে বললো, ‘শোনো, আমি খেয়াল করে দেখেছি, তোমাদের উপমহাদেশের মেয়েরা এইসব বিষয়ে একদম মুখ খুলতে চায়না। তাই প্রথমে কিছু বলেনা। পরে যখন মুখ খোলে, সব প্রমান নষ্ট হয়ে যায়। ব্যাপারটায় তোমার কিন্তু কোনো দোষ নেই। শরীরে কোনো আঘাত-টাঘাত থাকলে এখনি বলো।’
নায়লা তাকে আশ্বস্ত করলো তেমন কিছুই হয়নি। মহিলা বললেন, ‘আচ্ছা, তাহলে আমি সব লিখে নিচ্ছি। তুমি বলছো যে একজন সাক্ষী ঘটনার পর ঐ লোককে তোমার বাসায় দেখেছে?’ নায়লা সায় দিলো।
নায়লা জিজ্ঞেস করলো, ‘লোকটার কি শাস্তি হতে পারে?’ মহিলা লিখতে লিখতে জবাব দিলো, ‘ঐ লোকের ইউনিভার্সিটির ডিগ্রী ও প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করার লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু পুলিশ কেস হয়তো হবেনা।’
মহিলা লেখা শেষে বললেন, ‘নাও, সাইন করো নীচে।’ নায়লা জিজ্ঞেস করলো, ‘কেউ জানবে না তো এই ঘটনা?’ মহিলা ওর কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘এই ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত থাকতে পারো। পুরো ব্যাপারটি বন্ধ ঘরে করা হয়। শুধু লোকটির পরিবার এবং তুমি থাকবে।’
নায়লা তাও ইতস্তত করে বললো, ‘আমি কাল এসে সাইন করি?’
মহিলা বললো, ‘অবশ্যই। যতখুশী সময় নাও, কিন্তু লোকটাকে ছেড়ে দিওনা। আজ তোমার সাথে এইকাজ করেছে, কাল আরেক মেয়ের সাথে করবে। আর আমার মনে হয় তোমার কাউন্সিলিং লাগবে। তোমাকে কিছু ঠিকানা দিচ্ছি। এরা বিনে পয়সায় এইসব সমস্যা সমাধানে কাউন্সিলিং করায়। এইসব ঘটনা মনে খারাপ ছাপ ফেলে যায়।’

নায়লা বাসায় এসে চুপ করে বসে থাকে। চিন্তা করে কেইস ফাইল করলে ফলাফল কি হবে? লোকটির ইউনিভার্সিটির ডিগ্রী বাতিল হবে। তাতে তার কিছু যায় আসেনা। এই লোকের ইংলিশের যে অবস্থা, কানাডায় অড-জব করেই খেতে হবে। এর ইউনিভার্সিটির ডিগ্রী তেমন কাজে লাগবেনা। আর অন্যপ্রদেশে স্থানান্তরিত হলেই নতুন করে সব শুরু করতে পারবে। ঘটনা জানার পর ভাবীর মনের অবস্থা কি হতে পারে অনুমান করার চিন্তা করলো। ভাবীর কাছে দু’টি পথ খোলা আছে – প্রথমত, উনি জামান ভাইকে ছেড়ে দিতে পারেন। ঢাকায় বড়লোক বাবার বাড়িতে ভালোই থাকবেন উনি কিন্তু সারাজীবন একা থাকতে হবে। জামান ভাই এখন কানাডিয়ান সিটিজেন। ঢাকা থেকে আরেকটি কমবয়সি মেয়েকে বিয়ে করে আনা তার জন্য বা হাতের খেল হবে। নায়লার ধারণা মতে, ভাবী দ্বিতীয় পথই বেছে নেবেন, তা হলো---কিছুই করবেন না। মেনে নেবেন সবকিছু। ভাববেন, তার নিজেরই কোনো খামতি আছে, তাই স্বামী অন্য মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়েছে। উনি কোনো প্রতিবাদই করবেননা— বরং বাকী জীবন আরো কুঁকড়ে গিয়ে সংসারের ঘানি টানবেন।

সারাজীবন নায়লা নিজের যোগ্যতা দিয়ে যুদ্ধ করে সব কিছু অর্জন করেছে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে কম ঝামেলা পোহায়নি। তাই নিজেকে সে গর্ব করে ক্ষত্রিয় দাবী করে। এই মুহূর্তে নায়লা যতবারই ভাবীর নিরীহ চেহারা এবং নিস্পাপ বাচ্চা দু’টির চেহারা মনে করছে, ততোবারই দোটানায় পড়ে যাচ্ছে। এই সত্য প্রকাশে ভাবী এবং বাচ্চা দুটির অপূরনীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। সংসারে কিছু সত্য অপ্রকাশিত থাকাই সবার জন্য মঙ্গলজনক।

পরাজয়ের নিঃশ্বাস বুকে চেপে নায়লা তার মুঠোফোনটা টেবিল থেকে তুলে নেয়।
*******************************************************
উৎসর্গঃ বাংলাদেশে সেইসব শিশু এবং কিশোরীদের উদ্দেশ্যে; যারা নিজেদের বাসায় নির্যাতিত হয়েও মুখ বুজে থাকতে বাধ্য হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষত্যেও হবে। আবার পড়ুন, হিউম্যান রাইটসের মহিলা অফিসার ও নায়লার মাঝে কথোপকথনটি; বাংলাদেশে কবে নির্যাতিত মেয়েরা এই অধিকার পাবে?
এ সর্ম্পকিত লেখাঃ যৌন হয়রানি এবং ভিকটিমের পক্ষে আইন।

Tuesday, January 26, 2010

ভিনদেশের চিঠি হাউস অব ভলান্টিয়ারস

বিদেশে বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীরা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই স্ব স্ব পরিসরে পরিশ্রম আর মেধার স্বাক্ষর রাখতে সমর্থ হয়। কোনো দিক দিয়েই তারা উন্নতদেশের ছাত্রছাত্রীদের তুলনায় পিছিয়ে নেই। শুধু একটি ব্যাপারে বাংলাদেশী এই উজ্জ্বল মুখগুলো তাদের থেকে পিছিয়ে আছে। এদেশীয় ছাত্ররা যখন খুব উৎসাহ নিয়ে বলতে থাকে, ‘জানো আমি সামারে অমুক বৃদ্ধাশ্রমে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করেছি, তমুক স্কুলে কাজ করেছি,’ তখন আমাদের দেশী ছাত্রছাত্রীরা মুখ শুকনো করে শুনতে থাকে। ‘দেশের জন্য তেমন কিছুই করতে পারছিনা’ - এই উপলব্ধিটি অনেক প্রবাসীর মনেই কাঁটার মতো বিঁধে আছে। প্রবাসী অনেক ছাত্রছাত্রী বা কর্মজীবি মানুষের মাঝে এই ব্যাপারটি নিয়ে একধরণের নীরব অপরাধবোধও আছে। বাংলাদেশে পড়াশুনা করার সময়েও আমি ইউনিভার্সিটিতে আশেপাশের বন্ধুদের, সিনিয়রদের, জুনিয়রদের প্রায় একই অপরাধবোধে ভুগতে দেখেছি --- দেশের জন্য কিছু একটা করার ইচ্ছা আছে কিন্তু সহজে কোনো প্রকল্পে সম্পৃক্ত হবার সুযোগ নেই। ইদানিং ব্লগের দৌলতে বাংলাদেশের বেশ কিছু উৎসাহী-নিবেদিত তরুণতরুণীদের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে। দেশের বিভিন্ন সমস্যায় তারা বেশ ভালো মতোই নিজেদেরকে আত্মিকভাবে যুক্ত করে ফেলেন এবং কিছু একটা করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন।
নানা দেশী, বিদেশী প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নে সবসময়ই কাজ করে চলেছে। আবার অনেকে ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগী হয়ে দেশোন্নয়নে নানারকম প্রকল্প গ্রহণ করেন। তারমাঝে ‘হাউজ অফ ভলান্টিয়ারস’ সংগঠনটির সহজবোধ্য দর্শন আমাকে বেশ আকৃষ্ট করেছে। ২০০৯ -এর অক্টোবরে হঠাৎ করেই আমি হাউজ অফ ভলান্টিয়ারসদের কথা জানতে পেরেছি। তারপর তাদের ওয়েবসাইট পড়ে এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের কাজকর্মের পরিধি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানার সুযোগ লাভ করেছি। এই সংগঠনটির মূলমন্ত্র হলো —উন্নয়নশীলদেশগুলোর মূলত: শিক্ষাক্ষেত্রে সহজ কিছু প্রকল্পের মাধ্যমে অল্প খরচে, অধিক ফলপ্রসূ এবং দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করা। সংগঠনটির অবকাঠামো দেশীয় জনবল ও সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে ফলপ্রসূ উন্নয়নের আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। অন্যতম সংগঠক আশীরুল আমিন বলেন, ‘আমারদের মূল লক্ষ্য দেশের তরুণদের এবং ছাত্রদের সেবামূ্লক কাজ করার ইচ্ছা ও উৎসাহকে গঠনমূলক ও শিক্ষাকেন্দ্রিক কিছু প্রকল্পের কাজে লাগানো।’ এই সংগঠনের সাথে খুব সহজেই দেশী ও প্রবাসী বাংলাদেশীরা নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করতে পারবেন বলেই আমার বিশ্বাস।
‘হাউজ অফ ভলান্টিয়ারস’ এর ভিতটা গড়ে উঠেছিলো বহু আগে। ২০০১ এর দিকে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (এম.আই.টি) একটা অফিস থেকে ভালো ভালো অনেক বই দান করা হচ্ছিল। তখন এম.আই.টি.র ‘বাংলাদেশ স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন’ বাংলাদেশে বই পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছিলো। ঐসময় প্রায় ৩৫০ বই অ্যামেরিকার এম-ব্যাগ নামের এক পোস্টাল সার্ভিসের মাধ্যমে বাংলাদেশের ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম সহ বিভিন্ন জেলার বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছিলো। দেশে বই পাঠানোর ঐ উদ্যোগটি তখন বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিলো। এরপর কয়েকবছর বিরতির পর ২০০৬ সালে এম.আই.টি.র তৎকালীন ছাত্র সুদীপ্ত সরকার ও প্রাক্তন ছাত্রী নাবিলা আলমের নেতৃত্বে পুনরায় বই ও গবেষণাপত্র সংগ্রহের উদ্যোগ ‘বুকড্রাইভ ফর বাংলাদেশ’ প্রকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এম.আই.টি.র বিভিন্ন অফিস, ডর্মিটরি থেকে বই সংগ্রহ ছাড়াও বস্টন ও আশেপাশে এলাকার ছাত্রছাত্রী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রবাসী বাংলাদেশীদের কাছ থেকেও বই সংগ্রহ করা শুরু হয়। সেই বছর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের নিউ ইংল্যান্ড এলাকার (যুক্তরাষ্ট্রে মেইন, নিউ হ্যাম্পশায়ার, ভারমন্ট, ম্যাসাচুসেটস, রোড আইল্যান্ড, কানেক্টিকাট এই ৬টি অঙ্গরাজ্যকে একসাথে নিউ ইংল্যান্ড বলা হয়) প্রবাসী বাংলাদেশীদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অফ নিউ ইংল্যান্ড’ ঐ প্রকল্পকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো - তারা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা ছাড়াও অন্যান্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো। বই সংগ্রহ চলাকালীন ২০০৭ সালের মার্চ মাসে শাহজালাল ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অফ কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এর ঠিকানায় ডঃ জাফর ইকবালকে কিছু বই পাঠানো হয়। ঢাকায় বুয়েটে ডঃ মুহাম্মদ কায়কোবাদ এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু শিক্ষাবিদের কাছেও বই পাঠানোর পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছিলো। ঠিক ঐ সময় অ্যামেরিকার এম-ব্যাগ নামের ঐ পোস্টাল সার্ভিসটি বন্ধ হয়ে গেল। এই এম-ব্যাগ পোস্টাল সার্ভিসটি দিয়ে বই পাঠানো অনেক সস্তা ছিলো, কোনো কাস্টমসের ঝামেলা ছাড়াই যাকে পাঠাতে চাচ্ছে, ঠিক সেই প্রতিষ্ঠানের দরজায় পৌছে যেতো বইভর্তি বাক্সটি। দান করা বই সস্তায় দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর মূল পরিকল্পনাটিই ভেস্তে যাচ্ছিলো প্রায়। অ্যামেরিকার পোস্টাল সার্ভিসের বিকল্প পন্থায় পাঠাতে গেলে বেশ অনেক খরচ পড়ে যাবে, তাই বাংলাদেশে বই পাঠানো বন্ধ হয়ে গেলো। তাই বলে বই সংগ্রহ করা বন্ধ থাকেনি। প্রকল্পটির নানা অনিশ্চয়তার মাঝেও বস্টন প্রবাসী বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীরা ভাল বই পেলেই দেশের জন্য সংগ্রহ করে রাখছিলেন। ২০০৭-এর গ্রীষ্মে আমিনুল হকের প্রচেষ্টায় ও উদ্যোগে ব্র্যান্ড্যাইস ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরি থেকে বিশ্বমানের নানা গবেষনাপত্রের একটি বড় ধরণের চালান ‘বুকড্রাইভ ফর বাংলাদেশ’ প্রকল্পের জন্য সংগ্রহ করা হয়েছিলো। অনেক ভলান্টিয়ার মিলে বই সংগ্রহ করে বিভিন্ন বাসার বেইসমেন্টে, গ্যারেজে বইগুলো জমিয়ে রাখছিল। প্রবাসী বাংলাদেশীরা যে যেভাবে পেরেছেন সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছেন। যেমন- ভলান্টিয়ার আলী সাফকাত আকন্দ তাঁর বাড়ির বিশাল গ্যারেজের পুরোটাই ছেড়ে দিয়েছিলেন সংগৃহিত বইগুলো জন্য, আতিক/মসীহ তাদের ব্যস্ত দোকানের নীচতলায় অনেকখানি জায়গা ছেড়ে দিয়েছিলেন মাসের পর মাস বইগুলো রাখার জন্য।
আরেক প্রবাসী সংগঠন ‘ভলান্টিয়ারস এসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ’ এর একটি প্রকল্প ‘কম্পিউটার লিটারেসি প্রোগ্রাম’ এর আওতায় প্রবাসীদের আর্থিক অনুদানে বাংলাদেশের গ্রামের স্কুলে কম্পিউটার সেন্টার খোলার একটি কার্যক্রম চালু আছে। ঢাকার তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান/ এন.জি.ও. ডি.নেট এই কাজটি করে থাকে। ঐ প্রকল্পের একজন ইন্টার্ন হিসেবে প্রবাস থেকে আশীরুল আমিন বাংলাদেশে গিয়ে কাজ করেছিলেন ২০০৬ এর দিকে। উনি বস্টনে ফেরত গিয়ে তার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রকল্পটির মূল পরিকল্পনায় কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করলেন। তখন বস্টন প্রবাসী আদনান ইউসুফ কম্পিউটারগুলোতে মাইক্রোসফটের অপারেটিং সিষ্টেমের বিকল্প হিসেবে ওপেন সোর্স অপারেটিং সিষ্টেম ব্যবহারের বুদ্ধি দিলেন। এইসব পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীদের সম্পৃক্ত করার চিন্তা নিয়ে আদনান ইউসুফ, আশীরুল আমিন এবং সুদীপ্ত সরকার মিলে ভলান্টিয়ার নির্ভর ‘কম্পিউটারস ফর বাংলাদেশ’ প্রকল্পটি শুরু করেন।
২০০৮ এর প্রথম দিকে এই দুটি প্রকল্পকে একত্রিত করে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবার চেষ্টা করা হচ্ছিলো। তখন এম.আই.টি.র ছাত্র সুদীপ্ত সরকার এবং ইয়াসীন জামান মিলে এম.আই.টি.র একটি ছাত্রসংগঠন হিসেবে ‘হাউজ অফ ভলান্টিয়ারস’-এর গোড়াপত্তন করেন। এই ব্যাপারে সুদীপ্ত বলেন, ‘আমরা তখন প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার বেশ প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলাম। মিটিং করার অথবা বইগুলো সংরক্ষণের জায়গার অভাব ছাড়াও নানাবিধ কারণে আমাদের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পৃক্ত হবার প্রয়োজন ছিলো। দেশের জন্য আমাদের উদ্যোগগুলো শিক্ষাকেন্দ্রিক ও ছাত্রনির্ভর - সেদিক দিয়ে এম.আই.টি.র ছাত্রসংগঠন হিসেবে ‘হাউজ অফ ভলান্টিয়ারস’কে অন্তর্ভূক্ত করতে পারাটা আমাদের প্রকল্পগুলোর জন্য তাৎপর্য্য বয়ে এনেছিল। আবার এর আরেকটি সুবিধা হলো দেশের ছাত্র-ছাত্রীরা যখন ভলান্টিয়ার হিসেবে ‘হাউজ অফ ভলান্টিয়ারস’ এর জন্য কাজ করবে, তখন তাদের সঙ্গে এমআইটির একটি যোগসূত্রও তৈ্রী হবে।’ এম.আই.টি.র তৃতীয় বর্ষের বাংলাদেশী ছাত্র রাকিবুল ইসলাম কেতন ‘এম.আই.টি.-হাউজ অফ ভলান্টিয়ারস’ এর বর্তমান প্রেসিডেন্ট। তিনি একই সাথে এই সংগঠনের তৃতীয় প্রকল্প ‘আই-স্কুল’ এর প্রধান পরিকল্পক। বর্তমানে ‘হাউজ অফ ভলান্টিয়ারস’ বাংলাদেশ সরকারের রেজিস্ট্রিভুক্ত এবং বাংলাদেশের বুয়েট, ব্রাক এবং আই.বি.এ.তে এর ছাত্র অঙ্গসংগঠন (স্টুডেন্ট চ্যাপ্টার) আছে। এই সংগঠনের বাংলাদেশের কেন্দ্রীয়কমিটির সাধারন সম্পাদক একরামুল হক শামীম বাংলাদেশে এর সাফল্য ও সম্ভাবনার ব্যাপারে অত্যন্ত আশাবাদী। এই সংগঠনের একটি বিশ্বজনীন আবেদনও রয়েছে। এ ব্যাপারে কেতন বলেন, ‘এম.আই.টির অনেক বন্ধুরা তাদের নিজেদের দেশে এই সংগঠনের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অন্য কোনো উন্নয়নশীল দেশের কেউ যদি ‘হাউজ অফ ভলান্টিয়ারস’ এর প্রকল্পগুলো ঐ দেশের পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তন করে বাস্তবায়ন করতে চায় তাতে তাদের বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই বরং সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা হবে।’
বর্তমানে হাউজ অফ ভলান্টিয়ারসের বাংলাদেশে তিনটি প্রকল্প রয়েছে। আমি সংক্ষেপে এই প্রকল্পগুলোর বর্ণনা দেবার চেষ্টা করছিঃ
১) বুকড্রাইভ/ বুকস্ ফর বাংলাদেশ (বই সংগ্রহ প্রকল্প): এই প্রকল্পের মূলভাবনা হলো উন্নতদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে একাডেমিক বই ও জার্নাল সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনামূল্যে বিতরণ করা। প্রবাসী বাংলাদেশীরা স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, প্রতিষ্ঠান থেকে বই সংগ্রহ করে দেশে পাঠাতে পারে। সেইজন্য বিশ্বের যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ে উৎসাহী বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীরা হাউজ অফ ভলান্টিয়ারসের স্টুডেন্ট চ্যাপ্টার খুলতে পারে। ‘হাউজ অফ ভলান্টিয়ারস’ এব্যাপারে তাদের তথ্যগত ও কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দিতে পারে। বস্টন ও আশেপাশে এলাকার বিভিন্ন ছাত্রছাত্রী ও প্রবাসী বাংলাদেশীদের কাছ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১০,০০০ (দশ হাজার)-এর অধিক বই ও গবেষনাপত্র (জার্নাল) সংগ্রহ করা হয়েছে যেগুলো ফেব্রুয়ারী ২০১০ নাগাদ দেশে পৌঁছে যাবে। তবে এই বই পাঠানো ব্যাপারটি কোনো এককালীন প্রক্রিয়া না হয়ে নিয়মিত ব্যবধানে যেনো বই পাঠানো হয় সংগঠকরা এই ব্যাপারে বার বার জোর দিচ্ছেন।
পরবর্তীতে দেশের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাবিদদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে একাডেমিক বই ও গবেষনাপত্র সংগ্রহের বিষয় নিবার্চনে জোর দেয়া হবে। আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরিগুলোর মাঝে যেহেতু বই আদান প্রদানের ব্যবস্থাটি প্রচলিত নেই (ইন্টার লাইব্রেরি বুক লোন সিস্টেম), এই প্রকল্পের ভবিষ্যত পরিকল্পনা হলো দেশে একটি লাইব্রেরির মতো করে তাদের সংগৃহিত বই ও গবেষনাপত্রগুলো সেখানে সংরক্ষণ করা। তারপর সেগুলোর তালিকা তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে তুলে দিয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে।
২) ওপেন সোর্স কম্পিউটার এডুকেশন প্রোগ্রামঃ ‘আমি কম্পিউটারের নাম শুনেছি, কিন্তু কখনো ছুঁয়ে দেখিনি।আমার জন্য কম্পিউটার শেখা একটি স্বপ্ন। আপনারা যদি আমাদের এখানে একটি কম্পিউটার শেখার জায়গা করে দেন, তাহলে আমার একটি স্বপ্ন সত্যি হবে।’ কথাটি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার জয়নগর গ্রামের অষ্টম শ্রেনীর ছাত্র ঝন্টুর হলেও এই স্বপ্ন আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় সমস্ত ছাত্রছাত্রীর। দেশের অবহেলিত ছাত্রছাত্রীদের কাছে কম্পিউটার প্রযুক্তি সহজলভ্য করাই সংগঠনের দ্বিতীয় প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এই প্রকল্পটির আওতায় প্রবাসীদের আর্থিক অনুদানে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোতে কম্পিউটার সেন্টার খোলা হচ্ছে। ভলান্টিয়ার ছাত্রছাত্রীদের সহায়তায় স্থানীয় শিক্ষকদের কম্পিউটার ট্রেনিং দেয়া এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা প্রদান করাও এই প্রকল্পের অন্তর্গত। খরচ কমাতে এবং কারিগরি সুবিধার জন্য প্রচলিত ‘মাইক্রোসফট অপারেটিং সিষ্টেম’ এর বিকল্প ওপেন সোর্স অপারেটিং সিষ্টেম ‘উবুন্তু’ ব্যবহার করা হচ্ছে। কম্পিউটার শিক্ষা প্রসারে ‘উবুন্তু’ এর স্পেশাল প্যাকেজ ‘এদুবুন্তু’ এবং ‘এম.এস. অফিস ওর্য়াডের’ বিকল্প হিসেবে ‘ওপেন অফিস’ ব্যবহার করা হচ্ছে। সংগঠক আদনান ইউসুফ বলেন, ‘ওপেন সোর্স অপারেটিং সিষ্টেম ব্যবহার করার সুবিধা হলো এটি সহজে আপগ্রেড করা যায়। এর অনেক এ্যাড-অন বিনামূল্যে পাওয়া যায়। যেকেউ চাইলেই কপিরাইট আইন ভঙ্গ না করে সুবিধামতো আরো পরিবর্তন করতে পারেন। এছাড়া এতে বাংলাদেশে পাইরেটেড সফটওয়ার ব্যবহারের অনৈতিক ব্যাপারটিও সীমিত হবে।’ এই প্রকল্পের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো বাংলাভাষায় সহজবোধ্যভাবে কম্পিউটার শিক্ষাপ্রসারে বাংলা ওপেন সোর্স উইকির প্রচলন ও প্রসার। ওপেন সোর্স বাংলা উইকি ব্যাপারটি হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সবাই মিলে একসাথে বাংলায় কম্পিউটার শিক্ষার জন্য পাঠ্যক্রম প্রস্তুত করা। এতে যে কেউ কম্পিউটার শিক্ষা সম্পর্কিত তথ্য সরাসরি পাঠ্যক্রমে অর্ন্তভুক্ত করতে পারবে।

ধরুন, কেউ নিজ গ্রামে স্কুলে একটি কম্পিউটার সেন্টার খুলতে চান। তিনি যদি ‘হাউজ অফ ভলান্টিয়ারস’কে কম্পিউটার কেনার খরচ প্রদান করেন, তবে এই সংগঠনটি সেই স্কুলে একটি কম্পিউটার সেন্টার স্থাপন করতে সহায়তা করবে। এরপর ইলেক্ট্রিসিটি বিল, টিচারদের বেতন ইত্যাদি কম্পিউটার সেন্টার চালানোর খরচ সাধারণত স্কুল কর্তৃপক্ষ বহন করে থাকেন আর কারিগরি সহায়তার জন্য সংগঠনটির ভলান্টিয়াররা সদাপ্রস্তুত। এখন পর্যন্ত দেখা গেছে, প্রবাসী বাংলাদেশীরাই তাদের স্মৃতিবিজরিত গ্রামে প্রিয়জনের নামে কম্পিউটার সেন্টার খুলতে ‘হাউজ অফ ভলান্টিয়ারস’দের সাথে যোগাযোগ করেছেন।
৩) আই-স্কুলঃ আই-স্কুলের মূলভাবনা হলো আমাদের দেশীয় পাঠ্যপুস্তকগুলোর (মূলত পদার্থবিজ্ঞান, গণিত এবং রসায়নবিজ্ঞান) সহায়ক ভিডিও সিডি বানিয়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কাছে পৌছে দেয়া। এই প্রকল্পে ‘হাউজ অফ ভলান্টিয়ারস’দের সহায়তায় আমাদের পাঠ্যপুস্তকগুলোর বিভিন্ন জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণার এনিমেশন সংস্করণ বানানো হচ্ছে। বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট ছাত্রছাত্রীদের হাতে কলমে করে দেখানোর মতো কারিগরি সুবিধা এবং যন্ত্রপাতি আমাদের দেশের বেশীরভাগ স্কুলেই নেই। সেই সব এক্সপেরিমেন্টের ভিডিও করে বইয়ের অধ্যায় অনুযায়ী পর পর সাজিয়ে ভিডিও সিডি আকারে প্রস্তুত করা হবে।
ইতিমধ্যে ‘হাউজ অফ ভলান্টিয়ারস’রা এস. এস. সি.র পদার্থবিজ্ঞান বইয়ের উপর ভিত্তি করে ভিডিও সিডি বানানোর প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করেছে। ভিডিও সিডিগুলোর ইংরেজী ও বাংলায় ধারাবর্ণনা করা দুটি সংস্করণই থাকবে। আপাতঃ পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই সিডিগুলো দেশের স্কুলে স্কুলে পৌছে দেয়া হবে এবং প্রয়োজনে ভলান্টিয়ারদের দ্বারা প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এর পাশাপাশি ভবিষ্যতে আই-স্কুলের লেকচার সিরিজ বিনামূল্যে যেনো সবাই ইন্টারনেট হতে ডাউনলোড করে ব্যবহার করতে পারে সেই পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাকিবুল ইসলাম কেতন এম.আই.টি.র পি.এস.সি. ফেলোশিপ নিয়ে আই-স্কুলের ধারণাটির বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০০৯ এর জানুয়ারীতে আই-স্কুলের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পে উনি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আই.বি.এ.র ১০ জন ছাত্র পঞ্চগড়ের ৮ টি স্কুলের নবম ও দশম শ্রেনীর ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাদান করে আশাতীত ফল লাভ করেছেন। এই প্রকল্পটি এম.আই.টি.র অর্থায়নে ও ‘হাউজ অফ ভলান্টিয়ারসের’ কর্মতৎপরতায় ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে তার লক্ষ্যের দিকে। সেবার পঞ্চগড়ে আই-স্কুলের ২ জন মেধাবী ছাত্রছাত্রীকে স্কলারশীপ দেয়া হয়েছিলো -এই স্কলারশীপের ব্যবস্থা ভবিষ্যতেও চালু থাকবে।
হাউজ অব ভলান্টিয়ার্সের সাথে আরও অনেকে নানাভাবে জড়িত। সবার কথা এখানে লেখা গেল না বলে দুঃখিত। তবে পরবর্তীতে বাকীদের কথা লিখতে পারব বলে আশা রাখি। বাংলাদেশের কেউ শিক্ষাসেবামূলক কাজে আগ্রহী হলে হাউজ অফ ভলান্টিয়ারসের কাছে ইমেইল করতে পারেন অথবা তাদের ওয়েবসাইটে ঘুরে আসতে পারেন।
হাউজ অফ ভলান্টিয়ারসের ইমেইল: hov-exec@mit.edu
হাউজ অফ ভলান্টিয়ারসের ওয়েবসাইট: http://web.mit.edu/hov/www/index.html

বই দেশে পাঠানো, কম্পিউটার সেন্টার খোলা এবং অন্যান্য নানারকম সাংগাঠনিক কাজের জন্য ‘হাউজ অফ ভলান্টিয়ারস’ এর আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। যে কেউ চাইলে এই সংগঠনকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতে পারেন। এখানে উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীদের জন্য ‘হাউজ অফ ভলান্টিয়ারস’ সংগঠনকে দান করা অর্থ আয়করমুক্ত (tax-exempt status under Section 501(c)(3)) হিসেবে বিবেচিত হবে।

যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীরা এম.আই.টি-র নামে চেক লিখে চেকের উপর House of Volunteers কথাটা লিখে নিচের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলেই তা হাউজ অফ ভলান্টিয়ারসের কোষাগারে জমা হয়ে যাবে:


Attn: Kimberley B. Balkus
Director, Alumni Records
MIT Alumni Association
600 Memorial Drive, W98-220
Cambridge, MA 02139-4822,
U.S.A.

দেশের প্রতি আমাদের সত্যিকারের মমত্ব গড়ে উঠবে যদি আমরা দেশের বিভিন্ন কাজে নিজেদের কোনো না কোনো ভাবে জড়িত করতে পারি। ছোট ছোট পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার নীতি নিয়ে 'হাউজ অফ ভলান্টিয়ারস’রা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার মানোয়ন্ননে তাদের ভূমিকা রেখে চলেছে। এই উদ্যোগের একজন সহযোদ্ধা আপনিও হতে পারেন।

Tuesday, December 29, 2009

My 10 commandments

1. Living well without stepping on other’s soul.

2. Try to be content in your life whatever you do.

3. Speak the truth and be honest as it saves your butt ultimately.

4. Have a sense of loyalty, but not to the point where you sell off your morals and ethics.

5. Whatever sexual activities u do, maintain your sexual ethics.

6. Do not depend on anybody, especially for financial reasons as it captivates ur soul.Be clear with any kind of transactions, payback your loan as soon as possible.

7. Religion is something that regulates your morality, if u don’t believe in any religion, try to have ur own morality.

8. Assess and evaluate people and pay respect accordingly. Pay proper respect to the people who actually deserves-specially to the people with good basic traits.

9. Help the people who actually are qualified…don’t create more beggars.

10. Be powerful but also be humble.